ঢাকা শহরের জুলাই মাসের অঝোর বৃষ্টি যেন আকাশের ক্যানভাসে অশ্রু ঝরাচ্ছিল। গুলশানের একটা ছোট ক্যাফেতে বসে ছিল সে—আরিয়ানা। বয়স ২৬। একজন স্বাধীন ইলাস্ট্রেটর এবং চিল্ড্রেন্স বুক লেখিকা। তার চোখে সবসময় একটা স্বপ্নের ছায়া। বাইরের বৃষ্টি দেখতে দেখতে সে নোটবুকে আঁকছিল একটা ছোট্ট মেয়ের ছবি, যে বৃষ্টির ফোঁটায় নৌকা ভাসাচ্ছে।
ঠিক তখনই ক্যাফেতে ঢুকলেন রাহাত। ভিজে যাওয়া শার্ট, চুল থেকে পানি ঝরছে। হাতে একটা পুরনো অ্যাকোস্টিক গিটারের কেস। সে একজন স্বাধীন সংগীতশিল্পী, যে রাতের শো করে আর দিনে গান লেখে। তার চোখে একটা অদ্ভুত শান্তি আর অস্থিরতার মিশ্রণ। ক্যাফের একমাত্র খালি টেবিলটা আরিয়ানার পাশেই।
“এখানে বসতে পারি?” জিজ্ঞাসা করল রাহাত।
আরিয়ানা মাথা নেড়ে সম্মতি দিল। বৃষ্টির শব্দের মাঝে তাদের প্রথম কথা শুরু হলো না। কিন্তু চোখাচোখি হতেই কিছু একটা ঘটে গেল। যেন দুটো আলাদা নক্ষত্রের আলো একসাথে মিলল।
পরের দিন আরিয়ানা তার প্রকাশকের অফিসে গিয়ে শুনল, তার নতুন বইয়ের জন্য গান লাগবে। প্রকাশক বললেন, “একটা নতুন মিউজিশিয়ান আছে—রাহাত। তার গানগুলো খুব আলাদা। দেখো তো।”
আরিয়ানা অবাক হয়ে দেখল, সেই বৃষ্টির দিনের ছেলেটি। রাহাতও চমকে উঠল। দুজনেই হেসে ফেলল।
“পৃথিবীটা ছোট, না?” বলল রাহাত।
“না, বরং ভাগ্য খুব চালাক,” জবাব দিল আরিয়ানা।
তারা একসাথে কাজ শুরু করল। আরিয়ানার গল্প আর রাহাতের সুর। প্রতি সন্ধ্যায় তারা ধানমন্ডির ছাদে বসে কাজ করত। আরিয়ানা বলত তার ছোটবেলার গল্প—কীভাবে তার বাবা চলে যাওয়ার পর মা একা তাকে মানুষ করেছে। রাহাত বলত তার স্বপ্নের কথা—একটা গানের স্কুল খুলবে গ্রামে, যেখানে গরিব শিশুরা বিনামূল্যে গান শিখবে।
তাদের মধ্যে কোনো নাটকীয় প্রেমের ঘোষণা ছিল না। ধীরে ধীরে, প্রতিটা কথায়, প্রতিটা হাসিতে, প্রতিটা নীরবতায় ভালোবাসা বেড়ে উঠছিল। একদিন বৃষ্টিতে ভিজতে ভিজতে রাহাত গিটার বাজিয়ে গাইল:
“তোমার আঁকা রঙে আমার গান মিশে যায়,
এই শহরের ভিড়েও তুমি আমার নির্জনতা হয়ে যাও...”
আরিয়ানার চোখে জল চলে এল। সে বুঝল, এটা শুধু গান নয়। এটা স্বীকারোক্তি।
রাহাতের পরিবার ছিল রক্ষণশীল। তার বাবা একজন অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তা। তিনি চাইতেন ছেলে ব্যাংকে চাকরি করুক, বিয়ে করুক ভালো ঘরের মেয়েকে। আরিয়ানা যে স্বাধীনভাবে থাকে, ছবি আঁকে আর লেখে—এটা তাদের কাছে “অস্থির জীবন” মনে হতো।
আরিয়ানার মা অবশ্য খোলামেলা। কিন্তু তিনিও চিন্তিত ছিলেন। “মা, ভালোবাসা কি সবসময় নিরাপদ পথে আসে?” জিজ্ঞাসা করেছিল আরিয়ানা।
একদিন রাহাতের বাসায় ডাক পড়ল আরিয়ানার। ডিনার টেবিলে বাবা সরাসরি বললেন, “তোমার জীবনযাপন আমাদের সাথে মানবে না।”
রাহাত চুপ করে ছিল। কিন্তু রাতে আরিয়ানাকে ফোন করে বলল, “আমি তোমাকে ছেড়ে দিতে পারব না। কিন্তু পরিবারও ছেড়ে যেতে পারব না।”
সেই রাতে আরিয়ানা খুব কেঁদেছিল। পরের দিন সকালে তার ডোরবেল বাজল। একটা পুরনো খাম। ভিতরে হাতে লেখা একটা চিঠি। কোনো নাম নেই। শুধু লেখা:
“তোমাদের প্রেমের গল্পটা আমি জানি। ১০ বছর পর তোমরা সুখী। কিন্তু এখন যদি হাল ছাড়ো, তাহলে সব শেষ। ভাগ্যকে বিশ্বাস করো। —একজন বন্ধু”
চিঠিটা দেখে আরিয়ানা অবাক। হাতের লেখা তার নিজের মতোই। কিন্তু সে তো লেখেনি। রাহাতকে দেখালে সেও অবাক। তারা দুজনেই ভাবল হয়তো কেউ মজা করছে। কিন্তু চিঠিটা তাদের মনে আশা জাগাল।
পরিবারের চাপে রাহাতকে একটা চাকরির অফার নিতে হলো চট্টগ্রামে। সে চলে গেল। আরিয়ানা ঢাকায় একা। তার আঁকা ছবিগুলোতে এখন শুধু দুঃখ। বইয়ের কাজ আটকে গেল।
এক রাতে সে স্বপ্ন দেখল। একটা বৃদ্ধ মহিলা এসে বললেন, “তোমার চিঠিটা আমি লিখেছিলাম। আমি তুমিই। ভবিষ্যত থেকে।”
স্বপ্নটা এতো স্পষ্ট যে আরিয়ানা ঘুম থেকে উঠে নতুন একটা চিঠি লিখল রাহাতকে। কিন্তু পাঠাল না। পরিবর্তে সে গ্রামে চলে গেল রাহাতের স্বপ্নের সেই স্কুলের জন্য জায়গা দেখতে।
রাহাত চট্টগ্রামে বসে গান লিখছিল। একদিন তার মোবাইলে একটা অজানা নম্বর থেকে মেসেজ: “তোমার গানটা এখনো আমার কাছে আছে। ফিরে এসো।”
সে বুঝল এটা আরিয়ানা। কিন্তু সে ফিরল না। পরিবারের চাপ আর নিজের দায়িত্ববোধ তাকে আটকে রেখেছিল।
ছয় মাস পর। ঢাকায় একটা বড় বইমেলা। আরিয়ানার নতুন বই প্রকাশিত হচ্ছে। বইয়ের নাম “বৃষ্টির চিঠি”। গল্পটা তার আর রাহাতেরই। শেষে সে লিখেছে—“কিছু প্রেম ভাগ্যের লেখা, আমরা শুধু পাতা উল্টাই।”
বইমেলায় রাহাত এসেছিল। ভিড়ের মাঝে দাঁড়িয়ে আরিয়ানাকে দেখল। তার চোখে এখনো সেই আলো। রাহাত এগিয়ে গেল।
“আমি ছাড়তে পারিনি,” বলল সে।
“আমিও পারিনি,” জবাব দিল আরিয়ানা।
সেদিন রাতে তারা ছাদে বসল। রাহাত গিটার নিয়ে গাইল। আরিয়ানা তার ব্যাগ থেকে সেই পুরনো চিঠি বের করল।
“এটা কে লিখেছে জানো?” জিজ্ঞাসা করল আরিয়ানা।
রাহাত মাথা নাড়ল।
তখন আরিয়ানা তার ব্যাগ থেকে আরেকটা চিঠি বের করল—যেটা সে স্বপ্ন দেখার পর লিখেছিল। দুটো চিঠির হাতের লেখা এক। আর তারিখ—একটা ১০ বছর পরের।
রাহাত অবাক হয়ে বলল, “এটা কীভাবে সম্ভব?”
আরিয়ানা হেসে বলল, “ভালোবাসা সবকিছু সম্ভব করে। হয়তো ভবিষ্যতের আমরা আমাদেরই সাহায্য করতে চেয়েছিলাম।”
দুই বছর পর। রাহাত তার গানের স্কুল খুলেছে ঢাকার কাছে একটা গ্রামে। আরিয়ানা সেখানেই তার স্টুডিও বানিয়েছে। তাদের প্রথম সন্তানের নাম রেখেছে “আশা”।
প্রতি বৃষ্টির দিনে তারা সেই ক্যাফেতে যায়। একই টেবিলে বসে। রাহাত গান গায়, আরিয়ানা আঁকে।
তাদের গল্পটা শুধু প্রেমের নয়। এটা বিশ্বাসের, ধৈর্যের, আর ভাগ্যকে নিজের করে নেওয়ার।
.jpg)
No comments:
Post a Comment